ভারতীয়
ছবিকে টেম্পেরামেন্টের দিক হতে দেখতে হলে, অনেক বেশী পরিশিলিত মনে হয়। ছবি নান্দনিক
দিক হতে কতটা অভিরুচির প্রত্যয় ব্যক্ত করবে তার পরিমান নির্ভর করে ছবির টেম্পেরামেন্টের
ওপর। ছবির নন্দনতত্ত্বের দিকগুলো খুঁতিয়ে দেখলে টেম্পেরামেন্ট ছবির প্রাণসঞ্চারকারী
উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ভারতীয় ছবিকে ব্যাখ্যা করলে তিনটি প্রধান অংশ পাই, এক-
রেখা, দুই- রঙ, আর তিন- আকার। টেম্পেরামেন্ট ছবির এই তিনটি উপাদানের সঙ্গেই ওতোপ্রতোভাবে
জড়িত। টেম্পেরামেন্টের ধরণ ধারণ আবার বেশী ভাস্বর ও আলোচনা সাপেক্ষ হয়ে যায় যদি সেকুলার
আর্ট ফর্মকে নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেকুলার আর্ট ভারতীয় শিল্পের প্রাণকেন্দ্র, কোনভাবেই
চিত্রশিল্পের ইতিহাস সেকুলার আর্টকে উপেক্ষা করে বিস্তৃত হতে পারে নি। চেতন, অতিচেতন
তথা অধিচেতনার হাত ধরে ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে নানান সেকুলার এলিমেন্ট উত্তোরোত্তর
বৃদ্ধি করেছে সেকুলার আর্ট ফর্মের শিল্প নির্মাণগত পরিকাঠামোগুলোকে। ফলস্বরূপ ছবিতে
জনজীবন মাত্রা পেয়েছে অনেক মূর্ত আকারে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলীতে
প্রসঙ্গত বলেছেন, শিল্প আঙ্গিক শিল্প মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ স্থান অধিগ্রহন করলেও তা
কখনোই রসের নির্ধারক রূপে ধার্য হতে পারে না। এইভাবে ছবিতে উঠে আসে বিমূর্ত কলা রসের
বৈচিত্র্যতা। সেকুলার আর্ট ফর্মে বিমূর্ততার ধারা সঞ্চারিত হলে এক সজীব ঐকানুভূতির
সৌন্দর্যবোধকে আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারি। সৌন্দর্যের সে সুষ্টু প্রকাশের ক্ষেত্রে টেম্পেরামেন্ট
অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। শিল্পবস্তু এবং শিল্পরূপ দুটো অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে ব্যক্ত হয়ে
নতুন সত্তার সৃষ্টি করে ছবিতে। রেখা, রঙ, আলো, ছায়া, আকারের সার্বিক আবেদন অর্থবহ হয়ে
ওঠে তখনই যখন টেম্পেরামেন্ট নিজের সূর মূর্ছনাকে সঠিক ভাবের উপাদান দ্বারা পরিচালিত
করে। ভারতীয় শিল্প রীতিতে ভাবের ব্যঞ্জনা অবজেক্টটিভিটিকে ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। স্থান
ও স্থানিকতার সার্বিক আবেদন শিল্পবোধের পরিসরে অসংখ্য প্যাটার্নকে সমগ্রতায় একত্রিত
করে। এইভাবে চিত্রকলা হেগেল বর্নিত ‘too objective’- হয়ে থাকার বদলে সেকুলার আর্ট ফর্মের
ছত্রছায়ায় ও বিমূর্ত শিল্পভাবের আশ্রয়ে ক্রমশ প্রাচীনকাল থেকে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করে
এসেছে মুক্ত শিল্প রূপ লাভের মধ্য দিয়ে।
ভারতীয়
গুহা চিত্রের ক্ষেত্রে ছবির টেম্পেরামেন্ট সুললিত। রঙের চাইতে রেখার দাপট সেখানে বেশী।
রেখা প্রতিসাম্যমূলক কম্পোজিশনের মধ্য দিয়ে নানান কাহানীকে বর্নণা করে চলেছে। কোথাও
চড়া রঙের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। পারসপেকটিভ এই সকল গুহা চিত্রের অপর এক মহামূল্যবান
সম্পদ যা ভারতীয় চিত্রকলাকে অনিবার্য ভাবে শিল্প বোধের অনন্য পর্যায়ে উত্থিত করেছে।
পারসপেকটিভের অভিনবত্ব গুহাচিত্রকে সার্থকভাবে আখ্যান সৃষ্টিতে সার্থকতা পেয়েছে। গুহাচিত্রের
কম্পোজিশনে টেম্পেরামেন্ট উৎসাহিত করেছে ছবিকে প্রয়োজনমত সঙ্গতি ও সংযম স্থাপনের মধ্যে
দিয়ে অগ্রসর হতে। আর এইভাবে গুহাচিত্রগুলো একটি নির্দিষ্ট ফর্ম সৃষ্টিতে একান্তভাবে
উপযোগী হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্য শিল্প কলার মাল্টিপল ভিশনের কাজ ভারতীয় গুহা চিত্রে দেখা
যায় না ঠিকই কিন্তু বস্তুতপক্ষে ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতের মাপজোগ দর্শককে ছবির অঙ্গ হিসেবে
দৃশ্য জগতের সঙ্গী করে তুলতে পুরোপুরি পারদর্শিতা অর্জন করেছে বারবার। এইভাবে ভারতীয়
গুহাচিত্রগুলো টেমেরামেন্টের এক অমোঘ নিদর্শন হয়ে থেকে গিয়েছে যুগ যুগ ধরে। রঙ নয় রেখাই
এই সকল ছবিকে আলো ছায়ার রূপরেখা নির্ধারণে সফলতা দিয়েছে। ভারতীয় ছবির টেমপেরামেন্টের
উৎকর্ষতা ধরা পড়ে মিনিয়েচার ফরম্যাটের মধ্যেও। মিনিয়েচার ছবিতে রঙের চাপা অভিব্যক্তি
টেম্পেরামেন্টকে দিয়েছে ছবির ক্ষেত্রে বিশেষ এক চরিত্রের রূপ। মিনিয়েচার টেকনিকে সংহতি
যাতে নষ্ট না হয় সেদিক হতে ড্র্য়িং যতখানি পারদর্শিতা অর্জন করতে সফল ঠিক তেমনি ভাবেই
রঙের বন্টনকেও হতে হয় অনেক বেশী মৃদুমন্দ্র মায়াময় ও সুললিত। মিনিয়েচার ছবির রেখার
চলন আলোকে অপূর্ব ভাবে সংশ্লেষন করে কম্পোজিশনকে সার্থকতা প্রদান করে। রাজস্থানী তথা
রাজপুত মিনিয়েচার যে টেনশন সৃষ্টি করতে সার্থক তার বিশিষ্ট চরিত্র ফুটে ওঠে আন্তরিকবোধ
এবং অনুভূতির প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। মিনিয়েচার ফরম্যাটে তাই ফ্যান্টাসির তুলনায় রিয়েল
অবজেক্টকে অথবা বাস্তব জগতের খুঁটিনাটিকে কোথাও ক্ষুন্ন না করে উপস্থাপন করা হয়। রিয়ালিজম
মিনিয়েচার ভঙ্গিমাতে এক নতুন রূপলাভ করে থাকে। মিনিয়েচারের ছদ্ম তাই অনবদ্য, এই প্রকাশ
সুন্দর। আকশ্মিকতার কোনো স্থান এই শিল্প রীতিতে নেই বললেই চলে।
পারসপেকটিভগত
ভাবে মিনিয়েচার শিল্প রীতির অভিনবত্ব ছবির সম্পদ স্বরূপ।মিনিয়েচারের পারসপেকটিভ পাশ্চাত্য
পারসপেকটিভের চাইতে সম্পূর্ন ভিন্ন এমনকি পরিপন্থী। ভ্যানিশিং পয়েন্টের ব্যবহারের তুলনায়
এখানে হরাইজেনটাল তথা ডায়াগনাল পারাসপেকটিভ দিয়ে ছবিতে বহুত্ব নিয়ে আসা সম্ভবপর হয়।
ছবির উপজীব্য ধারাবাহিকতায় কাহানী বর্ননে এই প্রকার পারসপেকটিভের রস সঞ্চারণা বিশেষ
মাধুর্য এনে দিয়েছে। মিনিয়েচার শিল্পের মাধ্যমে শিল্পের সামগ্রিকতা প্রতিফলিত হয় এবং
টেম্পেরামেন্ট ছবিতে বিচিত্রগামী ধারাবাহিক ঐতিহ্যকে সার্বিক রস সঞ্চারণার মধ্য দিয়ে
প্রকাশিত করে থাকে। টেম্পেরামেন্ট শিল্পের ঐশী শক্তির ধারক ও বাহকের ভূমিকায় অবতীর্ন।
আখ্যানধর্মী মিনিয়েচার ছবির ক্ষেত্রে পারসপেকটিভ এবং টেম্পেরামেন্ট তাই বিলক্ষণ প্রাণ
প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, নিখুঁত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ছবিকে করে তুলেছে কালজয়ী।
টেম্পেরামেন্ট
ও ভারতীয় ছবি নিয়ে আলচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি ভিক্টোরিয়ান পিরিয়ডের তেলরঙ ছবি নিয়ে
আলোচনা না করা হয়। রাজা রবি বর্মা এ সময় এঁকে চলেছেন একের পর এক মাস্টার পিস। ভারতীয়
দেব দেবী ও পুরাণকে নির্ভর করে ইউরোপীয় শৈলীকে কাজে লাগিয়ে তিনি যে ছবির বিনির্মানগুলো
করে চলেছিলেন সেখানেও টেম্পেরামেন্ট এক মূর্ত চরিত্র স্বরূপ। প্রিন্ট মিডিয়া আসার ফলে
ছবিতে তেল রঙের ব্যবহারের পাশাপাশি ছবি ছাপতে শুরু করল প্রেসে। রেখা ও আকারের পাশাপাশি
ছবিতে কালার টেম্পেরামেন্ট প্রথম প্রয়োজনীয় ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করল। কালার রিদমকে
ধরে রাখতে এবং রিয়ালিস্টিক প্রকাশ ভঙ্গিমাকে ভাস্বর ভূমিকায় উপস্থাপিত করতে ছবিকে হয়ে
উঠতে হয়েছে শিল্প সমন্বয়ের রূপ প্রকাশের যথাযথ বিশ্লেষিত আত্মপল্ধি স্বরূপ। শিল্প রসিক
যাতে ঐক্য বোধের মধ্য দিয়ে মানসিক প্রশান্তিকে খূঁজে পায় সেই মর্মে ছবিকে হয়ে ইঠতে
হয়েছে পরিমিত ভাবরসের যথার্থ সমন্বয়কারী। এখানে শিল্পী জীবনের লড়াই শুরু হয়েছে। সত্যকে
রক্ষার জন্য রাজা রবি বর্মার জীবনেও ঘটে চলেছে একের পর এক ছবির সঙ্গে সংঘাত। এ প্রসঙ্গে
রঁলার একটি উক্তিতে শিল্পী জীবনকে যথার্থ বর্নণা করে- ‘Be truth even through art
and artist have to suffer for it! If art and truth cannot live together then
let art disappear.’ শিল্পের দহন এখানেই শিল্পীর কল্পলোকের স্পর্শ পেতে তৎপর হয়, সচেষ্ট
হয় শিল্প ছন্দকে জীবন সুন্দরের মধ্য দিয়ে শাশ্বত করে তুলতে।
বস্ত
আশ্রিত শিল্প এইভাবে সঠিক টেম্পেরামেন্ট লব্ধ হয়ে ওঠে যথাযথ টেনশনের মধ্য দিয়ে। বিনোদবিহারী
মুখোপাধ্যায়ের কথায় – শিল্পী যখন নিরবিচ্ছিন্ন গতি উপলদ্ধি করে তখন তার শিল্পে দেখা
দেয় রস সৌন্দর্য। শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই গতিকেই বলা হয় ছন্দ বা Tension। ছবির টেম্পেরামেন্টেই
নিদির্ষ্ট করেছে ছবির গতিমুখ। বিশদভাবে ছবিকে দর্শকের সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম হতে প্রয়োজনীয়
টেনশনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। টেম্পেরামেন্ট ও টেনশনের এই মিলমিশটাই হল আর্টের গোড়ার
কথা। বিষয়বস্তু সেখানে আর মুখ্য থাকে না। বিমূর্ততা রচনার মধ্য দিয়ে শিল্পের স্পর্শ
নতুন সৃষ্টির সুবিন্যাসে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। আসেলে আর্ট তো কোনো পদার্থ নয় যার হাত ধরে
নিজস্ব ধারণা অথবা বিচিত্র মতের প্রকাশ করা সম্ভবপর হবে। আর্ট হল জীবন চর্যার এক মূল
সূত্র। শিল্প তাই বিচিত্রগামী হতে পারে কিন্তু কখনই সর্বত্রগামী হয় না। শিল্পের ধারাবাহিক
ঐতিহ্য তাই শিল্পের ধারাকে নতুন দিশা দেখাতে তৎপর হয়। বিমূর্ততা ও বাস্তবতার মধ্যে
সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছে শিল্প ধারার অখন্ডতা। এই অখন্ডতাকে তিন ভাগে ভাগ
করে আলোচনা করা যেতে পারে- যথা শিল্পভাব, শিল্পবস্তু এব শিল্পপ্রকাশ। শিল্পের নন্দনতত্ত্ব
নৈর্ব্যক্তিকতার পথে চলার মর্যাদা অর্জন করেছে। শিল্পের প্রকাশ বৈচিত্র্যতা নানান ঘাত
প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পেয়েছে গাঢতা। নৈর্ব্যক্তিকতা বিমূর্তবাদের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে
কল্পনাকে করেছে ছবির মূল রসদ স্বরূপ। এইভাবে ছবিতে রস বোধ কল্পনাকে কেন্দ্র করে হয়ে
উঠেছে ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক। একদিকে যেমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিত্রকলা ভারতীয় ছবির
জগতকে পুষ্ট করেছে তেমনি অন্যদিকে সেকুলার আর্ট ফর্ম শিল্পীর অন্নবস্ত্রের সমস্যার
সমাধানের পাশাপাশি হয়ে উঠেছে ভারতীয় চিত্র নির্মান নীতির স্বকীয়তা স্বরূপ। কেবলমাত্র
বিমূর্ত আকার পরিচর্চার মধ্য দিয়ে শিল্প জগত আবর্তিত হয় না শিল্পীর দায়িত্ববোধ পরিচালিত
হয় সেকুলার এলিমেন্টকে শিল্পবদ্ধ করে তুলতে।
শিল্প
ও শিল্পীর জগত তাই বিচিত্র সত্তা নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। ভাষা ও আঙ্গিকগতভাবে
ছবির উন্মোচন হয় যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। প্রকৃত রসবোধে উত্তীর্ন ছবি তাই সর্বদাই
টেম্পেরামেন্টের দিক হতে অর্থব্যঞ্জক। মুক্ত বিচারের পথ সেখানে সর্বদা খোলা থাকে। ভাবমুখী
বিশ্লেষণ যেমন আকার পায় তেমনি বৈচিত্র্যতা ও বিমূর্তাতাও শক্তিশালী এলিমেন্ট হিসেবে
ছবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। শিল্প হয়ে ওঠে রস লোকের উৎকর্ষ এক উপাদান। গ্রহনযগ্যতা
ছবির পরিসরকে অনেক বেশী পদবাচ্য হয়ে উঠতে সাহা্য্য করে। এ ক্ষেত্রে এই লেখায় ছবির বাজারমূল্যের
দিকটিকে একেবারেই বিচার্য হিসেবে রাখা হ্য় নি। ছবির টেম্পেরামেন্টের নির্নায়ক হিসেবে
এখন বাজার মূল্য এক বিরাট ভূমিকা পালন করে। আধুনিক শিল্পে ভারতীয় ছবির বাজার ও ছবির
টেম্পেরামেন্ট সম্পূর্ণ আলাদা বিশদ আলচনার দাবী রাখে। ভারতীয় ছবির বিবর্তনের পথে ক্লাসিক্যাল
পিরিয়ডে ছবির টেম্পেরামেন্ট নিয়েই এই লেখায় অতএব শিল্প শৈলীর গুনাগুন আলোচিত হল। ছবির
টেম্পেরামেন্ট সর্বজন গ্রাহ্য আবেদনকে তথা শিল্পের সাবজেক্টিভিটিকে সমগ্রে পরিণত করতে
পারলেই ছবির যথার্থতা ও সৌন্দর্যের ধারণা প্রকাশিত হয়।
No comments:
Post a Comment